ছবি: সংগৃহীত
অপ্রতিমের মর্মান্তিক নিখোঁজ ও পাহাড়ের জঙ্গল থেকে মরদেহ উদ্ধার কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা
বাড়ির মূল দরজায় কাঠের ওপর খোদাই করা রয়েছে ‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে নাহিদ ও শাহরিয়ার’। চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে পা রাখতেই যে কারও চোখে পড়ত তেরো বছর বয়সী ছোট্ট অপ্রতিমের শৈশব থেকে কৈশোরের নানা মুহূর্তের অজস্র ছবি। মায়ের কোলে, বাবার পাশে কিংবা একা কাটানো সেই স্মৃতিগুলো এখন কেবলই হাহাকার হয়ে রইল। গত শুক্রবার দুপুরে মায়ের একটি আইফোন হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বের হয়েছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। এর প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামসংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করত। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন এবং মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এই দম্পতির সাজানো সংসার এখন গভীর শোকের মাতম চলছে।
অনুসন্ধান প্রক্রিয়া, মুন অ্যালার্ট এবং জঙ্গল থেকে মরদেহ উদ্ধার
ছেলে বাড়ি না ফেরায় আতঙ্কিত পরিবার প্রথমে সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। পাশাপাশি মা নাহিদা বেগম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পাশাপাশি সিআইডির জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা ‘মুন অ্যালার্ট’-এর ফটোকার্ড শেয়ার করে ছেলের সন্ধান চান। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় তার ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা গেলেও এরপর থেকে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
শনিবার সকালে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে স্থানীয় শ্রমিক মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী ও তাঁর সঙ্গীরা শিশুটির মরদেহ দেখতে পান। তারা মাথায় রক্ত দেখে আতঙ্কিত হয়ে স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশকে খবর দেন। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা

ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম
মা-বাবার আহাজারি এবং শিক্ষক-সহপাঠীদের প্রতিক্রিয়া
ছেলেকে হারিয়ে অনেকটাই বাক্রুদ্ধ বাবা শাহরিয়ার। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ওকে দুপুরে খাবার খাইয়েছি। পরে বললাম, বাবা, তুমি আজ বাইরে যেয়ো না। আমরা একসঙ্গে একটু ঘুরি, মুভি দেখব বাসায়। বিকেলে তোমাকে একটা ভালো গিফট দেব। সে বলল, “বন্ধুদের সঙ্গে আজ বাইরে যাব।” এরপর চলে গেল। আর ফিরল না।’ তাঁর প্রশ্ন, সামান্য একটা আইফোনের জন্য ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো? তিনি এ হত্যার বিচার চান।
একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা নাহিদা বেগম। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন, আসামিরা আইফোন নিয়ে গেলেও কেন তার নিষ্পাপ সন্তানকে এমন নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হলো। বাবা শাহরিয়ারও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন; দুপুরে ছেলেকে খাইয়ে বিকেলে একসঙ্গে মুভি দেখা ও উপহার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা আর পূরণ হলো না।
বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান জানান, অপ্রতিম অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এবং পড়াশোনায় মনোযোগী এক শিক্ষার্থী ছিল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এ শরীফুল করীম ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করে দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।
সন্দেহভাজন আটক ও খোয়া যাওয়া মোবাইল উদ্ধার
পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ১৭ বছর বয়সী দুই কিশোরকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে একজনকে এবং অপরজনকে এসআরবির সহায়তায় আটক করা হয়। এছাড়া শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সালমানপুর এলাকা থেকে নিহতের মায়ের সেই আইফোনটি উদ্ধার করে জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, বেশ কিছু ক্লু নিয়ে পুলিশ কাজ করছে এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও দোষীদের ফাঁসির দাবিতে রবিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হত্যাকাণ্ডের জেরে রবিবার সাধারণ শোক ঘোষণা করে সকল ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত রেখেছে। BDUS News 24 পোর্টালের পক্ষ থেকেও এই মর্মান্তিক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হচ্ছে। কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা
কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত আপডেট জানুন BDUS News 24







