
বিকেলের নরম রোদে বারান্দার গ্রিল ধরে আনমনে দাঁড়িয়ে আছে নিঝুম। চারপাশের কোলাহল যেন তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। তার মনের ভেতর বইছে এক অদ্ভুত ঝড়। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সে বুঝতে পেরেছে, এই পৃথিবীতে সব হিসাব হয়তো মেলানো যায় না। বিশেষ করে ভালোবাসার হিসাব তো একেবারেই আলাদা।
ছোটবেলা থেকেই নিঝুমের স্বভাব ছিল একটু অন্যরকম। সে কাউকেই কোনো দিন কষ্ট দিতে পারত না। এমনকি নিজের অজান্তে কেউ আঘাত পেলেও সে সারাদিন অপরাধবোধে ভুগত। সে বিশ্বাস করত, ভালোবাসা মানেই হলো নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেওয়া, বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা না করে শুধু ভালোবেসে যাওয়া। কিন্তু জীবন কি সবসময় মানুষের এই সরল ভাবনাকে সম্মান জানায়? উত্তর হলো— না।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চেনা আঙিনায় তানভীরের সাথে পরিচয় হয়েছিল নিঝুমের। তানভীর ছিল অত্যন্ত মিশুক এবং চতুর প্রকৃতির মানুষ। প্রথম দেখায় তানভীরের হাসিমুখটি নিঝুমের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। সময়ের সাথে সাথে সেই পরিচয় গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। নিঝুম তার সমস্ত হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছিল তানভীরকে। তানভীরের একটুখানি মন খারাপ নিঝুমকে কাঁদাতো, আর তানভীরের মুখে সামান্য হাসি ফোটানোর জন্য সে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল।
কিন্তু মানুষ কি আসলেই সবার মন বুঝতে পারে? দিন যত গড়াতে লাগল, তানভীরের আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। সে নিঝুমের এই সহজ-সরল ভালোবাসাকে তার দুর্বলতা ভাবতে শুরু করল। যখনই তানভীরের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ বা সুবিধার প্রশ্ন আসত, সে এক নিমেষে নিঝুমের অনুভূতিগুলোকে পায়ে দলতে দ্বিধাবোধ করত না। নিঝুম সব বুঝেও শুধু এই ভেবে চুপ থাকত যে, হয়তো আজ হোক কাল হোক তানভীর তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে পারবে। সে বারবার নিজেকে বোঝাত, ভালোবাসায় কোনো শর্ত থাকতে নেই।
কিন্তু স্বার্থপরতার দেয়াল এত বেশি শক্ত হয় যে, সেখানে ভালোবাসার নরম ছোঁয়া টিকতে পারে না। একদিন সত্যি সত্যিই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলো নিঝুম। তানভীর তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য এমন এক চরম সিদ্ধান্ত নিল, যা নিঝুমের পুরো পৃথিবী ও বিশ্বাসের জগৎ গুঁড়িয়ে দিল। সেদিন নিঝুমের চোখের জল কোনো সাধারণ কান্না ছিল না; সেটি ছিল তার সারা জীবনের বিশ্বাসের অপমৃত্যুর কান্না।
সবচেয়ে অদ্ভুত এবং নির্মম সত্য হলো, এই পৃথিবীতে যারা কাউকে কষ্ট দিতে ভয় পায়, শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের কি এক পরিহাসে তারাই সবচেয়ে বেশি কষ্টের আঘাত পায়। কারণ তারা প্রতিশোধ নিতে জানে না, তারা শুধু সহ্য করতে জানে।
আজ অনেক বছর কেটে গেছে। নিঝুম এখন আর আগের মতো কাঁদে না। সে শিখে গেছে যে, সবার জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নয়। কিছু মানুষের জীবনে ভালোবাসার চেয়ে নিজেদের স্বার্থই সবকিছুর উপরে থাকে। তবুও গভীর রাতে নিঝুমের মন আনমনা হয়ে ভাবে— এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কি তবে সত্যি সত্যিই কোনো খাঁটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা টিকে থাকতে পারে না? নাকি ভালোবাসার অপর নামই হলো নীরবে কষ্ট পেয়ে যাওয়া?







