
ঘড়ির কাঁটা তার নির্দিষ্ট নিয়মে চলে, সূর্যের আলো কিংবা ঋতুচক্র কখনো নিজের গতিপথ বদলায় না। প্রকৃতি সব সময় তার নিয়মেই অটল থাকে। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে মানুষের আচরণ আর মানসিকতার যে পরিবর্তন ঘটে, সেটাই মূলত জীবনকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তোলে। প্রবাদ আছে— “সময় বদলায় না, বদলে যায় মানুষের মন। যোগ্যতার চেয়ে বেশি কিছু পেলে, মানুষ হয় মনুষ্যত্বহীন!” এই কথার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় আমাদের চারপাশের সমাজে।
গ্রামের সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে সুজন। ছোটবেলায় অভাবের সঙ্গে লড়ে বড় হয়েছে সে। তখন তার জীবনের লক্ষ্য ছিল খুব সামান্য—দুমুঠো ডাল-ভাত আর একটু সম্মানজনক জীবন। গ্রামের ধুলাবালি মাখা পথ ধরে যখন সে খালি পায়ে স্কুলে যেত, তখন তার মনে কোনো অহংকার ছিল না। মানুষের বিপদে সে সবার আগে এগিয়ে আসত। সবাই তাকে ভালোবাসত তার সরলতা এবং ভালো মনের জন্য। সুজন তখন বিশ্বাস করত, পরিশ্রম আর সততাই মানুষের আসল সম্পদ।
সময়ের স্রোতে ভাগ্য সুজনের প্রতি মুখ তুলে তাকাল। উচ্চশিক্ষা শেষ করে সে শহরে পা রাখল এবং একটা বড় প্রতিষ্ঠানে অভাবনীয় ভালো একটি চাকরি পেয়ে গেল। তার মেধার চেয়েও যেন ভাগ্য এখানে বেশি প্রসন্ন ছিল। যোগ্যতার মাত্রা যতটুকু ছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা তার মুঠোয় চলে এল। রাতারাতি তার জীবনযাত্রার মান বদলে গেল। শহরের আলিশান ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি আর ব্যাংক ব্যালেন্স—সব মিলিয়ে সে এক অন্য দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে গেল।
পতনটা শুরু হলো ঠিক এখান থেকেই।
মানুষ যখন নিজের যোগ্যতার মাপকাঠির চেয়ে অতিরিক্ত কিছু পেয়ে যায়, তখন অনেক সময় সে সেই প্রাপ্তির ভার সামলাতে পারে না। সুজনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। ক্ষমতার মোহে সে তার পুরোনো দিনগুলোর কথা ভুলে গেল। গ্রামের যে বন্ধুরা একসময় তার দুঃসময়ের সঙ্গী ছিল, তাদের ফোন ধরা সে প্রায় বন্ধ করে দিল। গরিব আত্মীয়স্বজনদের সে এখন এড়িয়ে চলে। অফিসে অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে তার আচরণ হয়ে উঠল অত্যন্ত রূঢ় ও উদ্ধত। ক্ষমতার অহংকারে সে যেন ভুলেই গেল যে সেও একদিন শূন্য থেকে শুরু করেছিল।
একদিন সুজনের গ্রামের সেই পুরোনো বন্ধু রহিম শহরে এল তার একটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে। অনেক কষ্টে সুজনের অফিসে গিয়ে সে দেখা করার সুযোগ পেল। কিন্তু সুজন তাকে সম্মান তো দূরের কথা, ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে মাত্র দুই মিনিটে অফিসকক্ষ থেকে বের করে দিল। রহিমের চোখে তখন অপমানের জল। সে বুঝতে পারল, সময় বা পরিবেশ বদলায়নি, বদলে গেছে সুজনের মনের ভেতরের মানুষটা। অতিরিক্ত পাওয়ার নেশা আর অহংকার তার ভেতরের মনুষ্যত্ববোধকে চিরতরে গ্রাস করে নিয়েছে।
টাকা-পয়সা, পদ-পদবি বা খ্যাতি মানুষকে সাময়িকভাবে বড় করতে পারে, কিন্তু তা মানুষের আসল চরিত্র গড়ে দেয় না। মানুষ যখন নিজের প্রাপ্য সীমার বাইরে অতিরিক্ত কিছু অর্জন করে, তখন অনেক সময় সে বিনয় হারিয়ে ফেলে। জীবনে যতই উন্নতি হোক না কেন, নিজের শেকড় এবং অতীতের সংগ্রামকে ভুলে যাওয়া মানে নিজের মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দেওয়া। তাই বড় হওয়ার চেয়ে একজন ভালো মানুষ হওয়া এবং মাটির মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা।







