প্রাচীন মিশরের কর সংগ্রহ ও হিসাব সংরক্ষণের ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম।(মূল ছবি: জাগো নিউজ ২৪ / ফটো সম্পাদনা ও ক্যানভা এডিট: BDUS News 24)
বর্তমান যুগে আয়কর, ভ্যাট কিংবা বিভিন্ন প্রকার সরকারি শুল্ক পরিশোধের সময় প্রায় অধিকাংশ মানুষের মনেই তৈরি হয় নানা দুশ্চিন্তা। অর্থ হিসাব করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা দেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই বেশ জটিল মনে হয়। তবে কর পরিশোধ নিয়ে সর্বসাধারণের এই অস্বস্তি কিন্তু আধুনিক সভ্যতার নতুন কোনো উদ্ভাবন নয়। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর পূর্বে প্রাচীন মিশরের সুসংগঠিত সমাজেও কর সংগ্রহ, ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং কর মওকুফের নানা ঘটনা হরহামেশাই ঘটত।
এমনকি প্রাচীন মিশরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে কর ফাঁকি দেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের অপরাধে ফারাওদের পক্ষ থেকে অপরাধীদের নাক কেটে দুর্গম অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠানোর মতো কঠোর বিধানও প্রচলিত ছিল।
নীল নদকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও কর ব্যবস্থার বিকাশ
প্রাচীন মিশরের সমগ্র সভ্যতা এবং জনজীবন মূলত গড়ে উঠেছিল নীল নদকে কেন্দ্র করে। কৃষি উৎপাদন, জীবিকা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ভিত্তি ছিল এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। ফারাওদের রাষ্ট্র পরিচালনা, বিশাল ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যায় মেটাতে প্রচুর সম্পদের প্রয়োজন পড়ত। সেই রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহ করতেই সাধারণ প্রজাদের ওপর কর ধার্য করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু হয়।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুর দিকে মিশরে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কর সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সে সময় ব্যাংক কিংবা আধুনিক কাগজের মুদ্রা ব্যবস্থা ছিল না। ফলে শস্য, গবাদিপশু, বস্ত্র ও বিভিন্ন উৎপাদিত দ্রব্যাদির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হতো। কৃষিজমির উৎপাদন ক্ষমতা অনুমানের জন্য নীল নদের পানির উচ্চতা পরিমাপে ‘নাইলোমিটার’ ব্যবহৃত হতো। কেবল কৃষিজাত পণ্যই নয়, রাষ্ট্রীয় নির্মাণকাজে সাধারণ মানুষকে বাধ্যতামূলক শ্রমও দিতে হতো, যা ইতিহাসে ‘কর্ভি’ নামে পরিচিত। প্রাচীন মিশরে কর ফাঁকির শাস্তি
প্রাচীন মিশরে কর ফাঁকির শাস্তি ও প্রশাসনিক কঠোরতা
যেখানে রাজস্ব আদায়ের কড়াকড়ি থাকে, সেখানে তা এড়ানোর প্রবণতাও তৈরি হয়। প্রাচীন মিশরও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ফসলের পরিমাণ কম দেখানো, সরকারি হিসাবে গরমিল করা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো ঘটনা তখনো দেখা যেত। ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণায় প্রাচীন মিশরে কর ফাঁকির শাস্তি হিসেবে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি অপরাধীর নাক কেটে নির্বাসনে পাঠানোর নজির পাওয়া যায়।
বিশেষ করে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে ফারাও হোরেমহেবের শাসনকালে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি দমনে অত্যন্ত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে অপরাধের ধরন এবং অঞ্চলভেদে শাস্তির মাত্রায় কিছুটা পার্থক্য থাকত। সরকারের অতিরিক্ত করের চাপ এবং প্রশাসনিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ প্রজাদের মধ্যেও অসন্তোষ সৃষ্টি হতো, যা শাসকদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করত।
রোসেটা স্টোন ও রাজকীয় কর মওকুফের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বখ্যাত রোসেটা স্টোনের শিলালিপির সঙ্গেও প্রাচীন মিশরের রাজস্ব নীতির এক বিশেষ রাজনৈতিক মেলবন্ধন রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ১৯৬ সালের ফারাও পঞ্চম টলেমির শাসনামলে প্রকাশিত একটি রাজকীয় ফরমান এই পাথরে খোদাই করা ছিল। সেই সময় পুরোহিত ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর ওপর থেকে বকেয়া কর মওকুফ ও ছাড় দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং পুরোহিতদের সমর্থন অক্ষুণ্ণ রাখতে সে যুগের ফারাওরা প্রায়শই করছাড়ের নীতি কৌশল হিসেবে গ্রহণ করতেন। সময়ের আবর্তনে রাজত্ব এবং মুদ্রাব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও করের ন্যায্যতা এবং রাষ্ট্রের পাওনা পরিশোধ নিয়ে জনগণের প্রশ্ন আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া সারে মিয়ানমারে বিস্ফোরক তৈরির মারাত্মক উদ্বেগ





