
ডিজিটাল মাধ্যম ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার করে অভিনব কায়দায় মাদক ব্যবসার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার সত্যতা মিলেছে রাজধানীতে। জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজ (Daraz)-এর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে ও অনলাইন ডেলিভারির মাধ্যমে উচ্চমাত্রার মাদক (তরল গাঁজা বা টিএইচসি) বিক্রির অভিযোগে রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে মোহাম্মদ আনিসুর রহমান (৪০) নামের এক কেমিস্টকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এই ঘটনায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের নতুন সংশোধনী অনুযায়ী সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের দায়ে এটিই দেশের প্রথম মামলা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
যেভাবে ধরা পড়ল অনলাইনের এই মাদক চক্র
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে একটি চক্র নামিদামি ই-কমার্স সাইট দারাজে সুগন্ধি সাবান বা প্রসাধন সামগ্রীর আড়ালে নিষিদ্ধ মাদক বিক্রি করছে—এমন গোপন সংবাদ পায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ডিএনসি’র কর্মকর্তারা ক্রেতা সেজে ওই প্ল্যাটফর্ম থেকে অনলাইনে একটি পণ্যের অর্ডার করেন। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট ডেলিভারিম্যানের মাধ্যমে সেই পার্সেল হাতে পাওয়ার পর তা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। ল্যাব টেস্টের রিপোর্টে দেখা যায়, ওই তরল পদার্থটিতে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং উচ্চমাত্রার ‘টিএইচসি’ (টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল) বা গাঁজার ঘনীভূত তরল নির্যাস রয়েছে।
পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর ডিএনসি কর্মকর্তারা আরও বড় ফাঁদ পাতেন। অনলাইনে আরও কয়েকটি বোতলের ফরমাশ দেওয়া হলে সেই পার্সেল পৌঁছে দিতে আসেন এক ডেলিভারিম্যান। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকার একটি ফ্ল্যাটে আকস্মিক অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ সিবিডি অয়েল, মাদক তৈরির বিভিন্ন কাঁচামাল ও সরঞ্জাম। এরপর কারখানার মালিক ও মূল অভিযুক্ত কেমিস্ট মোহাম্মদ আনিসুর রহমানকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অভিযুক্ত আনিসুর দীর্ঘ সময় জাপানে অবস্থান করেছিলেন এবং সেখানে থাকাকালীন বিশেষ উপায়ে গাঁজার তরল উপাদান দিয়ে তেল বা নির্যাস তৈরির কৌশল রপ্ত করেন। দেশে ফিরে তিনি ঢাকায় সুগন্ধি সাবান তৈরির আড়ালে এই অবৈধ মাদকের কারবার ফেঁদে বসেন।
সংশোধিত আইনে প্রথম সাইবার মাদক মামলা
এই ঘটনার পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বাড্ডা থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করে। মামলায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)-সহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নতুন সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(ক) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো সাইবার স্পেস ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে যদি কেউ মাদকদ্রব্য বা সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্সের অবৈধ ক্রয়, বিক্রয়, সরবরাহ, প্রচার বা বিজ্ঞাপন দেয়, তবে সেটি জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ডিএনসি মহাপরিচালক (ডিজি) হাসান মারুফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করে কেউ যেন মাদকের বিস্তার ঘটাতে না পারে, সেজন্য কঠোর বার্তা দিতেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর দারাজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, গ্রাহকদের আস্থা ও প্ল্যাটফর্মের আইনি নিরাপত্তা রক্ষায় তারা অত্যন্ত কঠোর নীতি অনুসরণ করে থাকেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছ থেকে মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তারা সংশ্লিষ্ট পণ্যটি তাদের ওয়েবসাইট বা প্ল্যাটফর্ম থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে নিয়েছেন এবং নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী ওই বিক্রেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ভবিষ্যতে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে তারা প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত মনিটরিং ও স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানিং জোরদার করেছেন বলে জানিয়েছে দারাজ কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-কমার্স বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে প্রাত্যহিক কেনাকাটা সহজ হলেও তা অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হওয়া ঠেকাতে পুলিশ ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর পাশাপাশি অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর নজরদারি আরও কঠোর করা জরুরি। বাড্ডার এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সাইবার অপরাধ ও অনলাইন মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে কঠোর বার্তা দিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।






